:: আল শাহরিয়ার হোসাইন অনি ::
প্রতিদিন আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের করিডোর ও বারান্দা দিয়ে হাঁটার সময় আমরা এক নীরব অথচ ভয়াবহ নিষ্ঠুরতার সাক্ষী হই। আমাদেরই কোনো এক সহপাঠী, যার চোখে স্বপ্ন আছে, মেধা আছে এবং একজন মানুষ হিসেবে মর্যাদার সঙ্গে বেঁচে থাকার পূর্ণ অধিকার আছে; তিনি প্রতিনিয়ত উপহাস, মৌখিক নির্যাতন এবং মানসিক হেনস্থার শিকার হচ্ছেন। তার তথাকথিত “অপরাধ” একটাই: তিনি সমাজের তৈরি করা রক্ষণশীল ও চিরাচরিত ছকের ভেতরে নিজেকে পুরোপুরি মানিয়ে নিতে পারেননি।
একজন লেখক ও প্রগতিশীল চিন্তার মানুষ হিসেবে আমি মনে করি, সমাজের প্রান্তিক ও অবহেলিত মানুষের পাশে দাঁড়ানো কেবল একটি মতাদর্শিক অবস্থান নয়; এটি একটি নৈতিক দায়িত্ব।
দুঃখজনকভাবে আমাদের সমাজে এলজিবিটিকিউ+ (LGBTQ+) অধিকার নিয়ে যেকোনো আলোচনা শুরু হলেই সেটিকে “পশ্চিমা সংস্কৃতির আগ্রাসন” কিংবা “ধর্মীয় মূল্যবোধের ওপর আঘাত” হিসেবে চিহ্নিত করার প্রবণতা দেখা যায়। অথচ সহানুভূতি, নিরাপত্তা ও সম্মান কোনো বিদেশি ধারণা নয়; এগুলো প্রতিটি মানুষের মৌলিক মানবিক অধিকার।
আমাদের তরুণ সমাজের একটি অংশকে তাদের পোশাক, জীবনধারা কিংবা ব্যক্তিগত সম্পর্ক বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত করা মানে ভয়, ভণ্ডামি এবং সামাজিক দমনের এক সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখা।
আমাদের নিজেদের এখন কিছু কঠিন প্রশ্ন করা প্রয়োজন। আমরা কেমন সমাজ গড়ে তুলছি, যেখানে কিছু ছাত্রসংগঠন বা উগ্র গোষ্ঠী নিজেদের সামাজিক বা রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে এমন কাউকে হেনস্থা করে, যে কেবল নিজের মতো করে বাঁচতে চায়? কেন একজন মানুষের ব্যক্তিগত সুখ, নিরাপত্তা ও মানসিক সুস্থতার চেয়ে সামাজিক চাপ ও কুসংস্কারকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হবে?
কারও পরিচয়, স্বভাব বা ব্যক্তিগত জীবনের কারণে তাকে অপমান বা টার্গেট করা কাউকে ধর্মের রক্ষক বানায় না; বরং সেটি নিছক নিপীড়ন ও ক্ষমতার অপব্যবহারকে প্রকাশ করে। প্রকৃত নৈতিক শক্তি ও মানবিকতা নিহিত আছে সহানুভূতি, সংযম এবং অন্যের মর্যাদাকে সম্মান করার মধ্যে।
আমাদের এমন একটি শিক্ষাঙ্গন ও সমাজ গড়ে তুলতে হবে, যেখানে প্রত্যেক শিক্ষার্থী তার পরিচয়, ব্যক্তিত্ব বা জীবনদর্শন যাই হোক না কেন, ভয়, অপমান কিংবা সহিংসতার আশঙ্কা ছাড়াই স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে পারে। কারণ নিরাপদে বেঁচে থাকার অধিকার, ভালোবাসার অধিকার এবং সম্মানের সঙ্গে নিজের পরিচয় বহন করার অধিকার সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য।


















