:: আয়শা সিদ্দিকা হিমি ::
ভালোবাসা, মানুষের অস্তিত্বের এক পরম ও ধ্রুব অনুভূতি। এটি কোনো সুনির্দিষ্ট শাস্ত্র বা ব্যাকরণে সীমাবদ্ধ নয়; বরং বিশ্বাস, শ্রদ্ধা, সহানুভূতি এবং আত্মিক গভীরতার এক অভিন্ন মেলবন্ধন। কিন্তু আমাদের এই তথাকথিত আধুনিক সমাজে ভালোবাসাকে তার এই বিশুদ্ধ স্বরূপে বিকশিত হতে দেওয়ার অবকাশ কোথায়? এখানে অনুভূতির পবিত্রতার চেয়ে ব্যক্তির পরিচিতিই মুখ্য হয়ে ওঠে। মানুষের হৃদয়ের গভীরতা মাপার আগে বিচার করা হয় তার বংশ, ধর্ম আর মতাদর্শ। এই কৃত্রিম পরিচয়ের দেয়ালই অনেক সময় মানবিক সম্পর্কের পথে দুর্ভেদ্য প্রাচীর হয়ে দাঁড়ায়।
আজকের এই লেখা কোনো তাত্ত্বিক আলোচনা নয়; এটি আমার হৃদয়ের গভীর এক ক্ষত থেকে উঠে আসা আর্তনাদ। ব্যক্তিগত জীবনে আমি এবং আমার প্রিয় মানুষ নাহিন যার সঙ্গে আমি ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন দেখি, এই নিষ্ঠুর সামাজিক বাস্তবতার শিকার। আমরা একে অপরকে শুধু ‘মানুষ’ হিসেবে দেখি, আর পরস্পরের স্বপ্ন, চিন্তা ও বিশ্বাসকে সম্মান ও ভালোবাসায় ধারণ করি। আমাদের এই সম্পর্কটি দাঁড়িয়ে আছে শর্তহীন পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও বোঝাপড়ার ওপর। কিন্তু সমাজ আমাদের সেই মানবিক দৃষ্টিতে দেখে না। তাদের কৌতূহলী ও সংকীর্ণ দৃষ্টিতে আমাদের সবচেয়ে বড় পরিচয় হয়ে ওঠে ‘ধর্মীয় ভিন্নতা’। সে একজন সুন্নি মুসলিম, আর আমি আহমাদিয়া সম্প্রদায়ের, এই পার্থক্যকেই তারা আমাদের ভালোবাসাকে অস্বীকার করার এবং আমাদের জীবনকে বিষিয়ে তোলার একটি সহজ হাতিয়ার হিসেবে বেছে নেয়।
আজ এই নিবন্ধের মাধ্যমে আমি রাষ্ট্রের বিবেক এবং সমাজের কাছে কিছু মৌলিক প্রশ্ন রাখতে চাই, কেন ভালোবাসার মতো একটি একান্ত ব্যক্তিগত ও মানবিক সম্পর্ককে ধর্মীয় পরিচয়ের সংকীর্ণ ফিতায় মাপা হবে? কেন দুইজন মানুষের একসাথে জীবন গড়ার সংকল্পের চেয়ে তাদের গায়ে সেঁটে দেওয়া ‘ধর্মীয় লেবেল’ বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে?
ধর্ম নিঃসন্দেহে মানুষের জীবনের একটি অপরিহার্য ভিত্তি; এটি আমাদের আত্মিক শান্তি এবং সংস্কৃতির ধারক। কিন্তু সেই ধর্ম কি কখনোই মানবিকতাকে গ্রাস করে নেওয়ার শিক্ষা দেয়? যখন ধর্মকে বিভেদের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়, যখন এটি ভালোবাসাকে অস্বীকার করার অজুহাত হয়ে ওঠে, তখন আমাদের গুরুত্বের সাথে ভাবা উচিত, আমরা কি সত্যিই ধর্মের মূল চেতনাকে ধারণ করছি, নাকি কেবল আচার-সর্বস্ব উগ্রতাকে প্রশ্রয় দিচ্ছি?
বাস্তবতা হলো, এই সমাজ সুকৌশলে মানুষের ব্যক্তিস্বাধীনতা ও অনুভূতিকে শৃঙ্খলিত করতে চায়। সমাজ চায় প্রতিটি মানুষ যেন তাদের নির্ধারিত গণ্ডির ভেতরেই আবর্তিত হয়। আর যখনই কেউ সেই তথাকথিত প্রথাগত সীমা অতিক্রম করার সাহস দেখায়, তখনই তার ওপর নেমে আসে তিরস্কার, সামাজিকভাবে হেয় করা, কিংবা সরাসরি শারীরিক ও মানসিক সহিংসতা। এমতাবস্থায় ভালোবাসা তখন আর কেবল একটি আবেগ থাকে না; এটি হয়ে ওঠে এক দুঃসাহসী লড়াইয়ের নাম।
আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, যে কোনো সম্পর্কের মূল ভিত্তি হওয়া উচিত পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং মানবিক রসবোধ। যদি দুইজন মানুষ একে অপরের বিশ্বাসকে সম্মান করে এবং সমান্তরাল পথ চলতে চায়, তবে শুধুমাত্র ধর্মীয় পার্থক্যের অজুহাতে সেই সম্পর্ককে অস্বীকার করা এক চরম নৈতিক অপরাধ।
আমাদের বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি হলো, দৃষ্টিভঙ্গির আমূল পরিবর্তন। আমাদের শিখতে হবে মানুষকে আগে ‘মানুষ’ হিসেবে মূল্যায়ন করতে, তার সামাজিক বা ধর্মীয় পরিচয় দিয়ে নয়। কারণ দিনশেষে আমাদের অভিন্ন পরিচয় আমরা রক্ত-মাংসে গড়া মানুষ, আর এই মানবিকতাই হওয়া উচিত আমাদের পরম ধর্ম।
ভালোবাসা কোনো বিচ্যুতি নয়, এটি কোনো সীমারেখাও মানে না। এই নির্মল অনুভূতিকে বিভক্ত করার অধিকার কারো নেই। আমি স্বপ্ন দেখি এমন এক আগামীর, যেখানে ভালোবাসাকে ধর্মের সংকীর্ণতা দিয়ে নয়, বরং মানবিকতার বিশালতা দিয়ে মূল্যায়ন করা হবে। আজকের এই প্রতিবাদী লেখনী সেই সুন্দর ভোরের প্রত্যাশায়।

















