শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬ | ৯:০২ পিএম
  1. Lead News
  2. অপরাধ
  3. অর্থনীতি
  4. আইন-আদালত
  5. আন্তর্জাতিক
  6. আমরা
  7. কর্পোরেট
  8. খেলাধুলা
  9. গণমাধ্যম
  10. চাকুরীর খবর
  11. জাতীয়
  12. ধর্ম
  13. প্রবাস
  14. ফিচার
  15. বিজ্ঞান-প্রযুক্তি

পিংক বাস নিয়ে আগ্রহ ও বাস্তবতা

প্রতিবেদক
যায়যায়দিন
September 1, 2026 10:26 am

:: সজীব ওনাসিস ::

১৮ আগস্ট ২০২৬ মঙ্গলবার রাজধানীর তেজগাঁওয়ে বিআরটিসি ট্রাক ডিপো প্রাঙ্গণে আনুষ্ঠানিকভাবে এই গোলাপি বাস সেবার উদ্বোধন করা হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও বগুড়ার ১৩টি রুটে ১৪টি বাস চলবে। এর মধ্যে ঢাকায় ১০টি, চট্টগ্রামে দুটি এবং বগুড়ায় দুটি বাস রয়েছে। প্ল্যান অনুযায়ী আগামী তিন মাসের মধ্যে বাসের সংখ্যা ৫০টিতে উন্নীত করার লক্ষ্য নেয়া হয়েছে।
এর আগেও এই সার্ভিস ছিল
রাজধানীতে নারী যাত্রীদের জন্য বিশেষ বাস সার্ভিস অবশ্য নতুন নয়। বিআরটিসি পরীক্ষামূলকভাবে প্রথম মহিলা বাস সার্ভিস চালু করেছিল ১৯৯৮ সালে। নারী আন্দোলনের দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ২০০১ সালের ২৫ অক্টোবর আবার আনুষ্ঠানিকভাবে এই সেবা চালু করা হয়। তখন ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় মোট ১২টি বাস রাখার প্ল্যান ছিল। কিন্তু বাস্তবে চার-পাচটির বেশি বাস নিয়মিত রাস্তায় চলতে দেখা যেত না বলে যাত্রীদের অভিযোগ ছিল। দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও বাস না পাওয়ার অভিযোগ ছিল নিয়মিত। কিছু বাস নারী উদ্যোক্তাদের লিজ দেয়া হয়েছিল। কিন্তু আর্থিক ক্ষতির কারণে এক নারী উদ্যোক্তা লিজ প্রত্যাহার করে নেয়ার ঘটনাও ঘটে। এরপর ২০০৯ সালে মহিলা বাস সার্ভিস পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগ নেয়া হয়। কিন্তু সেই উদ্যোগও কাঙ্ক্ষিত সাফল্য পায়নি।
অবশ্য সে সময় বাস চালক এবং কন্টাক্টরের জায়গায় দায়িত্বে ছিল পুরুষ। বর্তমান পিংক বা গোলাপি বাসের বৈশিষ্ট্যগুলোর একটি হলো— বাস চালাবেন নারীরাই এবং বাসে চালককে সহযোগিতা করবেনও এক জন নারী। তাই বলাই যায়, এখনকার উদ্যোগ অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে অধিক নারী বান্ধব। নারীরা অতীতের চেয়ে অনেক বেশি স্বস্তি অনুভব করবে এ ধরনের বাসে যাতায়াত করে। এ ছাড়া এর মাধ্যমে নারীরা বাস চালাতে পারবে না, এমন ধারণা বদলানোর সময় এসেছে। জানা গেছে, বাস চালানোর প্রশিক্ষণ নিতে অনেক নারীই আগ্রহ দেখাচ্ছে। এমএ বা বিএ পাস করে উপযুক্ত চাকরি খোজার চেয়ে ড্রাইভিং শিখে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা অনেক বেশি সম্মানের বলে মনে করছে তারা। বর্তমান সরকারের এই উদ্যোগকে তারা সাধুবাদ জানিয়েছে। তারা মনে করছে, কাজের ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের আলাদা সীমারেখা থাকা উচিত নয়। এ সংক্রান্ত এক রিপোর্টে দেখলাম, এমএ পাস করা এক জন বাসের নারী চালকের আসনে বসার এই সুযোগকে বিশেষ অভিজ্ঞতা হিসেবে দেখছেন। তিনি নারী চালকদের নিয়ে সামাজিক নেতিবাচক মন্তব্য না করার আহ্বান জানিয়েছেন। সুতরাং এ ধরনের সার্ভিসের পরিধি বাড়াতে হবে এবং এ ব্যাপারে সরকারকে বিশেষ নজর দিতে হবে।
কেন প্রয়োজন এই সার্ভিস
উন্নত কোনো দেশে নারীদের যাতায়াতের  জন্য আলাদা বাস সার্ভিস নেই। তবে এ দেশের বাস্তবতায় অনেক কারণেই নারীদের জন্যে এ ধরনের সার্ভিস প্রয়োজন। বাইরে যাতায়াতকারী যে কারো পক্ষে এর প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করা সম্ভব। রাস্তায় বেরোলে দেখা যায়, বিশেষত সকালে অফিসে যাওয়া এবং বিকালে অফিস ছুটির সময় রাস্তায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা বাসের জন্যে শুধু নারী নয়, পুরুষদেরও অপেক্ষা করতে দেখা যায়। এর প্রধান কারণ বাসের স্বল্পতা। শক্ত, সামর্থ্যবান ব্যতীত অপেক্ষাকৃত দুর্বল পুরুষের পক্ষেও এই সময়ে জোরজবস্তি করে বাসে ওঠা সম্ভব হয় না। নারীরা এক্ষেত্রে থাকে পুরো অসহায়। তাই নারীদের অপেক্ষার পরিধি হয় অনেক বেশি। একান্তই ভাগ্য ভালো থাকলে কোনো নারী হয়তো এই রাশ টাইমে বাসে কোনোমতে জায়গা করে নিতে পারে। আর এই ভিড়ের মধ্যে অনেক নারী অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শের শিকার হন। রাজধানীতে এ ধরনের বিব্রতকর অভিজ্ঞতা না হওয়াটাই বরং অস্বাভাবিক। এ ছাড়া বাসে নারীদের জন্যে নির্ধারিত আসনে পুরুষদের বসে থাকার নিত্য ঘটনা তো রয়েছেই। রাস্তায় এবং বাসের ভেতরে নারীদের বিভিন্নভাবে হয়রানির শিকার হতে হয় নিয়মিত। গন্তব্যে যাওয়ার তাড়া আছে। কিন্তু বাসস্ট্যান্ডে দাড়িয়ে থাকা নারীটির মনে স্বস্তি নেই। কখন বাস আসবে, বাসে জায়গা হবে কি না, ভিড়ের মধ্যে অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শের শিকার হতে হবে কি না— এমন নানা দুশ্চিন্তা নিয়েই প্রতিদিন গণপরিবহনে চলাচল করতে হয় অসংখ্য নারীকে। বিশেষ করে অফিস, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষাঙ্গনে ব্যস্ত সময়ে নারীদের জন্য সংখ্যায় নগন্য গণপরিবহন এই সমস্যাকে আরো কঠিন করে তোলে।
পিংক বাস চালুর আগের-পরের চিত্র
পিংক বাস চালুর মাধ্যমে নারীদের উদ্বেগ ও সমস্যার কতটা সমাধান হবে? এই নিবন্ধকার প্রায়শই বাসে যাতায়াত করে। তার চলার পথে এখন পর্যন্ত তিনি কোনো পিংক বাস দেখেননি। অর্থাৎ মেগাসিটি ঢাকায় সংখ্যার দিক দিয়ে পিংক বাসের সংখ্যা নগন্য। দ্রুত এই বাসের সংখ্যা বাড়াতে হবে। এ সংক্রান্ত বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রকাশিত রিপোর্ট থেকে দেখা গেছে, পিংক বাস চালুর পর অনেক ক্ষেত্রেই সাধারণ বাসে উঠতে নারীদের আগের তুলনায় বেশি বেগ পেতে হচ্ছে। তাদের প্রতি গণপরিবহনের কন্ডাক্টর, হেলপার, চালক, এমনকি পুরুষ যাত্রীদের বৈরী আচরণের চিত্র উঠে এসেছে। তারা নারী যাত্রীদের বাসে উঠতে দিতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে। কারণ, এখন নারীদের জন্য আলাদা বাস সার্ভিস রয়েছে। যদিও নারীদের জন্যে চালু হওয়া বাসের সংখ্যা খুবই কম। সোশাল মিডিয়ায় এক নারী তার হতাশার কথা তুলে ধরে জানান, নির্ধারিত স্টপেজে অনেকক্ষণ অপেক্ষা করার পরও তিনি বাসে উঠতে পারেননি, কারণ তাকে উঠতে দেয়া হয়নি। আরেক নারী যাত্রী পিংক বাস না চলা একটি রুটে দেরিতে একটি বাসে উঠতে পেরে কর্মস্থলে এক ঘণ্টা দেরিতে পৌছান। একইভাবে, এক কলেজের শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রে গণপরিবহনে উঠতে না দেয়ার কারণে তার সকালের নির্ধারিত ক্লাস মিস হয়ে যায়। শুধু নারী হওয়ার কারণে যদি বাসে উঠতে না  দেয়া হয়, তাহলে তারা কিভাবে শিক্ষা নেয়া, চাকরি করা এবং দেশ ও সমাজের জন্য অবদান কাজ করার সুযোগ পাবে?
এসব কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। সব বাসেই নারীদের জন্য নির্ধারিত কয়েকটি আসন রিজার্ভ থাকলেও ড্রাইভার এবং হেলপাররা নারী যাত্রীদের উঠাতে অনীহা প্রকাশ করত। পুরুষ কন্ডাক্টরদের এমন আচরণের পেছনে প্রধান কারণ হলো আমাদের পুরুষ তান্ত্রিক সমাজের মানসিকতা। এই দেশের জনসংখ্যার একটি বড় অংশ এখনো মনে করে, এক জন নারীর উচিত ঘরেই থাকা, সন্তানদের লালন-পালন করা এবং ঘরের যাবতীয় কাজের দায়িত্ব নেয়া। আর এখন তো সরকার ব্যাপক প্রচার চালিয়েছে যে, নারীদের জন্যে আলাদা বাস চালু করা হয়েছে। তাই তারা নতুন অজুহাত খুজে পেয়েছে। বাসে উঠতে চাওয়া নারীদের মুখের ওপর বলে দিচ্ছে নারীদের বাসের জন্য অপেক্ষা করার জন্যে। যে রুটে এখনও পিংক বাস চালু হয়নি, সে সব জায়গায় বাস কর্মচারিদের আচরণ একই রয়ে গেছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নারীদের এক প্রকার জোর করেই গণপরিবহনে উঠতে হয়। নারীদের নির্ধারিত সিটে পুরুষ যাত্রী বসে থাকলে সেখানেও অধিকারের কথা বলতে হয়। তবে সে অধিকার আদায় হবে তার কোনো গ্যারান্টি নেই। এ ক্ষেত্রে নারী খুব কম  ক্ষেত্রেই অন্য যাত্রীদের সমর্থন পায়।
বদলাতে হবে পুরুষতান্ত্রিক ঔদ্ধত্য
দীর্ঘদিন ধরে পুরুষতন্ত্র নারীদের শিক্ষা গ্রহণ ও আর্থিকভাবে স্বনির্ভর হয়ে ওঠা ঠেকাতে ধর্ম, পারিবারিক সম্মান, বিয়ের যোগ্যতা, সামাজিক মর্যাদা এবং নিরাপত্তাহীনতাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে আসছে। পুরুষ শাসিত সমাজের প্রতিটি পদক্ষেপে এসব বাধা থাকা সত্ত্বেও নারীরা বহু আগে থেকেই স্বাচ্ছন্দ্যের গণ্ডি পেরিয়ে, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণ করে এবং কর্মজীবনে প্রবেশ করে সেই সব পুরুষ তান্ত্রিক রীতিনীতি ও মানসিকতাকে চ্যালেঞ্জ করে আসছে। বর্তমান অবস্থায় আসতে গিয়ে তারা যৌন হয়রানি, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন এবং নানা ধরনের সামাজিক নিয়ন্ত্রণ ও ভয়-ভীতির শিকার হয়েছে। সরকার যখন নারীদের যাতায়াতে কিছুটা সুবিধা আনতে পিংক বাস সার্ভিস চালু করার সময় কি এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে এর কোনো নেতিবাসক প্রভাব পড়বে কিনা তা ভেবে দেখেছিল? পিংক বাস চালুর পর চলমান পরিবহনের ড্রাইভার-হেলপারদের আচার-আচরণে সহজেই প্রতীয়মান হয়েছে যে, সরকারের নীতি-নির্ধারক বা প্ল্যানকারীদের এ বিষয়টি মোকাবিলায় কোনো প্রস্তুতি ছিল না।
এই অবস্থা উত্তরণের জন্য দ্রুত নারীদের জন্য আরো বেশি সংখ্যক নির্ধারিত বাস চালু করা, অনলাইন টিকিটিংয়ের ব্যবস্থা করা এবং সিসিটিভি ক্যামেরা, ফৃ ওয়াই-ফাই ও ট্রান্সপোর্ট ট্র্যাকিং সিস্টেমের মতো আধুনিক প্রযুক্তি সংযুক্ত করা এখন জরুরি। কিন্তু আমাদের সমাজের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকা অধিকাংশ পুরুষের মানসিকতায় গভীরভাবে নারী বিদ্বেষ ও পুরুষ তান্ত্রিক ঔদ্ধত্য কবে দূর হবে? এ জন্য দরকার আমাদের রাষ্ট্রের সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থায় যে বৈষম্য (বাংলা, ইংরেজি, আরবি) তা দূর করা এবং অবশ্যই সমাজকে দারিদ্র্য মুক্ত করা। শিক্ষা এবং দারিদ্র্য হচ্ছে যে কোনো সমাজের সামগ্রিক উন্নয়ন সূচকের প্রধান নিয়ামক। নারীর নিরাপদ চলাচলের জন্য বিশেষ বাস চালুর উদ্যোগ নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। কিন্তু আগের অভিজ্ঞতা বলছে, শুধু ভালো উদ্যোগ নিলেই হয় না, তার ধারাবাহিকতা, ব্যবস্থাপনা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হয়। বিচার হবে কয়েক মাস পর, যখন দেখা যাবে বাসগুলো নির্ধারিত সময়ে নিয়মিত চলছে কি না, যাত্রীরা পর্যাপ্ত সেবা পাচ্ছেন কি না, নারী চালকরা নিরাপদ কর্মপরিবেশ পাচ্ছেন কি না এবং বাসের সংখ্যা সত্যিই বাড়ছে কি না।
নারীদের প্রত্যাশা খুব বেশি নয়। তারা চান, ভিড়ের মধ্যে নিরাপদে বাসে উঠতে, স্বস্তিতে বসতে কিংবা দাড়িয়ে যেতে এবং কোনো ধরনের হয়রানি ছাড়াই গন্তব্যে পৌছাতে। পিংক বাস সেই নিশ্চয়তা কতটা দিতে পারে, এখন সেটিই দেখার বিষয়। পিংক বাসের পাশাপাশি অন্যান্য বাসেও নারীর সমঅধিকার নিশ্চিত করতে হবে। নারীর নিরাপত্তা শুধু বাসের ভেতরে করলেই হবে না; বাসে ওঠার আগে অপেক্ষার সময় এবং বাস থেকে নামার পরও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। অর্থাৎ, পিংক বাসের সাফল্য নির্ভর করবে বাসের ভেতরের নিরাপত্তা, স্টপেজের পরিবেশ এবং শেষ গন্তব্য পর্যন্ত নিরাপদ যাত্রা— এই তিনটি বিষয় কতটা নিশ্চিত করা যায় তার ওপর। একদিন হয়তো এমন দিন আসবে, পিংক বাস এবং সাধারণ গণপরিবহনের মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকবে না।
লেখক- সজীব ওনাসিস : ব্যবস্থাপনা সম্পাদক, দৈনিক যায়যায়দিন

সর্বশেষ - সারাবাংলা