শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬ | ৬:২৬ পিএম
  1. Lead News
  2. অপরাধ
  3. অর্থনীতি
  4. আইন-আদালত
  5. আন্তর্জাতিক
  6. আমরা
  7. কর্পোরেট
  8. খেলাধুলা
  9. গণমাধ্যম
  10. চাকুরীর খবর
  11. জাতীয়
  12. ধর্ম
  13. প্রবাস
  14. ফিচার
  15. বিজ্ঞান-প্রযুক্তি

বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ৪৮ বছরের অভিযাত্রা

প্রতিবেদক
যায়যায়দিন
September 1, 2026 2:51 pm

:: রাজু আলীম ::

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ১ সেপ্টেম্বর একটি তাৎপর্যপূর্ণ দিন। ১৯৭৮ সালের এই দিনে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান প্রতিষ্ঠা করেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি। স্বাধীনতার পর রাষ্ট্র পুনর্গঠন, বহুদলীয় গণতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের রাজনৈতিক দর্শনকে সংগঠিত রূপ দেয়ার লক্ষ্যেই এ দলের জন্ম হয়েছিল। ২০২৬ সালে বিএনপি ৪৮ বছরে পদার্পণ করেছে; এই দীর্ঘ পথচলা কেবল একটি রাজনৈতিক দলের ইতিহাস নয়, বরং বাংলাদেশের রাষ্ট্র, গণতন্ত্র, অর্থনীতি ও জাতীয় পরিচয়ের বিবর্তনের সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত।
স্বাধীনতার যুদ্ধ থেকে রাষ্ট্রনায়কের উত্থান
জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক আবির্ভাব কোনো পূর্বপরিকল্পিত ঘটনা ছিল না; বরং ইতিহাসের এক সংকটময় মুহূর্তে তিনি নেতৃত্বের কেন্দ্রে উঠে আসেন। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যা শুরু হলে তৎকালীন মেজর জিয়া বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠের মাধ্যমে তিনি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসে তিনি এক জন সেক্টর কমান্ডার হিসেবে যুদ্ধ পরিচালনা করেন এবং পরবর্তীকালে বাংলাদেশ সেনা বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্বে অধিষ্ঠিত হন।
কিন্তু ১৯৭৫ সালের আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং পরবর্তী অভ্যুত্থান-পাল্টা অভ্যুত্থানের ধারাবাহিকতা বাংলাদেশকে গভীর অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে দেয়। ৭ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহের পর জিয়াউর রহমান রাষ্ট্র পরিচালনার কেন্দ্রীয় ভূমিকায় আসেন। তার সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল ভেঙে পড়া রাষ্ট্রযন্ত্রকে পুনর্গঠন এবং সামরিক ও বেসামরিক উভয় কাঠামোয় স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা।
কেন প্রয়োজন হয়েছিল নতুন রাজনৈতিক দলের?
স্বাধীনতার পর ১৯৭৫ সালে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে এক দলীয় ব্যবস্থা চালু হয় এবং বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ বা বাকশাল প্রতিষ্ঠিত হয়। বহু রাজনৈতিক দল বিলুপ্ত হয়, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা সীমিত হয়ে পড়ে এবং রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র সংকুচিত হয়।
জিয়াউর রহমান বিশ্বাস করতেন, দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য কেবল প্রশাসনিক শক্তি যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন জনগণের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ এবং একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম। তিনি প্রথমদিকে বিদ্যমান রাজনৈতিক শক্তিগুলোর হাতে ক্ষমতা ফিরিয়ে দেয়ার সম্ভাবনাও বিবেচনা করেছিলেন। কিন্তু তৎকালীন বাস্তবতায় তিনি দেখেন, রাজনৈতিক অঙ্গনে কার্যকর জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার মতো সংগঠিত শক্তির অভাব রয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে তিনি দেশব্যাপী রাজনৈতিক, সামাজিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক পরিমণ্ডলের নেতাদের সঙ্গে ধারাবাহিক আলোচনা শুরু করেন। ন্যাপ, জাতীয় লীগ, সাম্যবাদী দল, গণমুক্তি ইউনিয়ন, বিভিন্ন আঞ্চলিক রাজনৈতিক সংগঠন এবং স্বাধীনতাপন্থি বুদ্ধিজীবীদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত এসব বৈঠকে নতুন জাতীয় রাজনৈতিক ধারার প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সেই দীর্ঘ প্রস্তুতির ফল ছিল বিএনপির জন্ম।
১ সেপ্টেম্বর ১৯৭৮ : রমনার ঐতিহাসিক ঘোষণা
১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর ঢাকার রমনা এলাকায় এক অনাড়ম্বর সংবাদ সম্মেলনে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেন। দলটি গঠিত হয় ১৯ দফা কর্মসূচি এবং ৩১ দফা ঘোষণাপত্রের ভিত্তিতে।
ঘোষণাপত্রে বলা হয়েছিল, জাতীয় ঐক্য, অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা, সামাজিক ন্যায়বিচার, গণতন্ত্র, বিকেন্দ্রীকরণ এবং স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি হবে দলের মূল ভিত্তি। উৎপাদনমুখী অর্থনীতি, স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করা, যুবসমাজকে রাষ্ট্রগঠনে সম্পৃক্ত করা এবং জনগণের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনার যে ধারণা তুলে ধরা হয়েছিল, সেটিই পরে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের রাজনৈতিক রূপরেখা হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।
দলের প্রথম স্থায়ী কমিটি, নির্বাহী কমিটি, পার্লামেন্টারি বোর্ড এবং ইলেক্টোরাল কলেজ গঠন করা হয়। ধানমন্ডি ২৭ নম্বরে প্রতিষ্ঠিত হয় বিএনপির প্রথম কেন্দ্রীয় কার্যালয়, যা পরবর্তীকালে নয়াপল্টনে স্থানান্তরিত হয়।
বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ : একটি রাজনৈতিক দর্শন
বিএনপির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আদর্শিক অবদান হলো বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ধারণা। এই দর্শনের মূল বক্তব্য ছিল-বাংলাদেশের স্বাধীন রাষ্ট্রসত্তা, ভাষা, সংস্কৃতি, ভূখণ্ড, ইতিহাস, ধর্মীয় সহাবস্থান এবং জাতীয় স্বার্থের সমন্বয়ে একটি স্বতন্ত্র জাতীয় পরিচয় নির্মাণ।
এই ধারণা বাঙালি জাতীয়তাবাদকে অস্বীকার করেনি; বরং স্বাধীন বাংলাদেশের বাস্তবতায় রাষ্ট্রকেন্দ্রিক জাতীয় পরিচয়কে গুরুত্ব দিয়েছে। জিয়াউর রহমান মনে করতেন, একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি, অর্থনীতি এবং সাংস্কৃতিক বিকাশের কেন্দ্রবিন্দু হওয়া উচিত বাংলাদেশের নিজস্ব স্বার্থ।
বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের এই দর্শন পরবর্তীকালে বিএনপির নীতিনির্ধারণ, অর্থনৈতিক পরিকল্পনা এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রথম অধ্যায়
বিএনপি প্রতিষ্ঠার কয়েক মাসের মধ্যেই জাতীয় নির্বাচনের ঘোষণা দেয়া হয়। ১৯৭৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত পার্লামেন্ট ইলেকশন ছিল স্বাধীনতার পর প্রথম বহুদলীয় জাতীয় ইলেকশন, যেখানে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল অবাধে অংশগ্রহণ করে।
এই ইলেকশনে বিএনপি ২০৭টি আসনে জয়লাভ করে সরকার গঠন করে। সংসদীয় রাজনীতির পুনর্জাগরণ, আইনসভাকে কার্যকর করা এবং ইলেকশনের মাধ্যমে ক্ষমতার বৈধতা প্রতিষ্ঠা- এসব পদক্ষেপ বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে ওঠে।
জিয়াউর রহমান একই সঙ্গে প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ, উপজেলা পর্যায়ে স্থানীয় সরকার শক্তিশালীকরণ এবং গ্রামীণ উন্নয়নকে রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকারে নিয়ে আসেন।
অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের রূপরেখা
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের অর্থনীতি ছিল যুদ্ধবিধ্বস্ত, খাদ্য সংকটগ্রস্ত এবং বৈদেশিক সহায়তার ওপর অত্যন্ত নির্ভরশীল। জিয়াউর রহমান উৎপাদন, কৃষি, রফতানি ও বেসরকারি উদ্যোগকে উৎসাহিত করে অর্থনীতির নতুন দিকনির্দেশনা দেন।
কৃষিতে সেচ সম্প্রসারণ, উচ্চফলনশীল বীজ, গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন এবং খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধির কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। একই সঙ্গে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে বিনিয়োগ উৎসাহিত করা হয় এবং রফতানিমুখী শিল্পের ভিত্তি শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেয়া হয়।
বহু অর্থনীতিবিদের মতে, আশির দশকে বাংলাদেশের রফতানি অর্থনীতির যে ভিত্তি তৈরি হয়, তার সূচনা হয়েছিল সত্তরের শেষভাগের এসব নীতিগত পরিবর্তনের মাধ্যমে। স্বনির্ভর অর্থনীতি, উৎপাদনের রাজনীতি এবং গ্রামীণ উন্নয়ন ছিল বিএনপির অর্থনৈতিক দর্শনের প্রধান স্তম্ভ।
জিয়ার নেতৃত্ব : সাহস ও ব্যক্তিগত সততার প্রতীক
জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ ছিল তার ব্যক্তিগত জীবনযাপন এবং প্রশাসনিক শৃঙ্খলার ওপর গুরুত্ব। তিনি মাঠপর্যায়ে সফর করে জনগণের সমস্যা শুনতেন, জেলা প্রশাসনকে সরাসরি জবাবদিহির আওতায় আনতেন এবং উন্নয়নকে কেবল রাজধানী কেন্দ্রিক না রেখে গ্রামবাংলার দিকে বিস্তৃত করার চেষ্টা করতেন।
তার নেতৃত্বের বৈশিষ্ট্য ছিল দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ, রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা এবং জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়া। মাত্র কয়েক বছরের শাসনামলে তিনি বাংলাদেশের রাজনীতিতে বহুদলীয় গণতন্ত্র এবং উন্নয়নমুখী রাষ্ট্রচিন্তার একটি নতুন ধারা প্রতিষ্ঠা করেন।
কিন্তু ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে একদল বিপথগামী সেনা সদস্যের হাতে তিনি নিহত হন। তার মৃত্যু বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক গভীর শূন্যতা সৃষ্টি করে।
খালেদা জিয়ার রাজনীতিতে আগমন
স্বামী জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর সময় খালেদা জিয়া ছিলেন সম্পূর্ণ এক জন গৃহিণী। রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার কোনো প্ল্যানই তার ছিল না। কিন্তু দলের নেতা-কর্মীদের অনুরোধ এবং বিএনপিকে সংগঠিত রাখার প্রয়োজনীয়তা তাকে রাজনীতিতে নিয়ে আসে।
১৯৮২ সালে তিনি বিএনপির প্রাথমিক সদস্যপদ গ্রহণ করেন। একই বছর এরশাদের সামরিক অভ্যুত্থানে নির্বাচিত সরকার অপসারিত হলে বিএনপি নতুন করে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনে অবতীর্ণ হয়। ১৯৮৩ সালে খালেদা জিয়া দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান এবং পরে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
সেই সময় থেকেই তিনি আপসহীন নেত্রী হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।
স্বৈরাচার বিরোধী সংগ্রামের নেতৃত্ব
আশির দশক ছিল খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক সংগ্রামের দশক। শিক্ষানীতি বিরোধী আন্দোলন, ছাত্রদলের গণঅভ্যুত্থান, সাত দলীয় জোট গঠন এবং এরশাদ বিরোধী ধারাবাহিক আন্দোলনে তিনি প্রধান নেতৃত্ব দেন।
বারবার গৃহবন্দি, গ্রেফতার এবং রাজনৈতিক দমন-পীড়নের মুখেও তিনি আন্দোলন চালিয়ে যান। ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানে বিএনপি, আওয়ামী লীগ, বামপন্থি দল ও ছাত্র সমাজের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের ফলে এরশাদ সরকারের পতন ঘটে এবং বাংলাদেশ আবার গণতান্ত্রিক ধারায় ফিরে আসে।
এই আন্দোলন প্রমাণ করে, বিএনপি শুধু সরকার গঠনের দল নয়; গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনেও একটি প্রধান রাজনৈতিক শক্তি।
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র পরিচালনায় বিএনপি
গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর বিএনপি একাধিকবার জনগণের ভোটে সরকার পরিচালনার দায়িত্ব পায়। রাষ্ট্র পরিচালনার বিভিন্ন পর্যায়ে অবকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষা সম্প্রসারণ, গ্রামীণ যোগাযোগ, বিদ্যুৎ উৎপাদন, তথ্যপ্রযুক্তি, বেসরকারি বিনিয়োগ এবং স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করার নানা উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের সম্প্রসারণ, প্রবাসী আয়ের গুরুত্ব বৃদ্ধি, কৃষির উৎপাদনশীলতা এবং বেসরকারি খাতের বিকাশেও বিএনপি সরকারের বিভিন্ন নীতির প্রভাব নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা হয়েছে। দলটির অর্থনৈতিক দর্শনে রাষ্ট্র ও বাজারের সমন্বয়, উদ্যোক্তা সৃষ্টি এবং উৎপাদন ভিত্তিক প্রবৃদ্ধিকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।
খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন শুধু রাষ্ট্র পরিচালনার ইতিহাস নয়; এটি নির্যাতন, নিপীড়ন, ষড়যন্ত্র এবং আপসহীন সংগ্রামেরও ইতিহাস। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে তাকে বারবার রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা করার চেষ্টা করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা দেয়া হয়েছে, দীর্ঘ সময় কারাবন্দি রাখা হয়েছে, চিকিৎসার সুযোগ সীমিত করা হয়েছে এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে রাখার নানা উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। তার পরিবার ও দলের নেতা-কর্মীদের ওপরও নেমে এসেছে মামলা, গ্রেফতার, হামলা ও হয়রানি।
খালেদা জিয়াকে রাজনীতি থেকে সরিয়ে দিতে তার বিরুদ্ধে হত্যার ষড়যন্ত্রও করা হয়েছিল। বিভিন্ন সময়ে তার নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়েছে, তার জনসভা ও রাজনৈতিক কর্মসূচিতে হামলা হয়েছে এবং তাকে শারীরিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করার চেষ্টা করা হয়েছে বলে দলটির নেতারা দাবি করেছেন। এসব ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে প্রশ্ন রয়ে গেছে।
তবু তিনি পিছিয়ে যাননি। স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের প্রতিটি সংগ্রামে তিনি রাজপথে থেকেছেন। গ্রেফতার, গৃহবন্দিত্ব, কারাবাস, মামলা এবং শারীরিক অসুস্থতা- কোনো কিছুই তার রাজনৈতিক অবস্থানকে দুর্বল করতে পারেনি। তিনি বারবার বলেছেন, জনগণের ভোটাধিকার ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে আপস করা যাবে না।
খালেদা জিয়ার এই সংগ্রাম বিএনপির নেতা-কর্মীদের কাছে রাজনৈতিক সাহসের প্রতীক। তার ওপর নির্যাতন যত বেড়েছে, দলের ভেতরে তার প্রতি আস্থা তত গভীর হয়েছে। তিনি দেখিয়েছেন, ক্ষমতার বাইরে থেকেও এক জন নেতা জনগণের অধিকার রক্ষার জন্য রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের বিরুদ্ধে দাড়াতে পারেন। তার দীর্ঘ সংগ্রাম আজও বিএনপির গণতান্ত্রিক আন্দোলনের অন্যতম প্রধান প্রেরণা।
নতুন প্রজন্মের নেতৃত্বে তারেক রহমান
একুশ শতকে বিএনপির সাংগঠনিক পুনর্গঠনের কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে আবির্ভূত হন তারেক রহমান। তিনি দীর্ঘ সময় দলীয় সাংগঠনিক কার্যক্রমে যুক্ত থেকে তৃণমূল পর্যায়ে বিএনপিকে পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেন।
রাজনৈতিক প্রতিকূলতা, দীর্ঘ নির্বাসন এবং বিভিন্ন আইনি ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের মধ্যেও তিনি দলের নীতিগত পুনর্গঠন, ডিজিটাল সাংগঠনিক কাঠামো এবং নতুন প্রজন্মকে রাজনীতিতে সম্পৃক্ত করার কর্মসূচি চালিয়ে যান।
২০২৬ সালে জাতীয় নির্বাচনে বিএনপির বিজয়ের মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশের প্রধান মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। দলের ঘোষিত ৩১ দফা রাষ্ট্রকাঠামো সংস্কার, জবাবদিহিমূলক শাসন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, নির্বাচন ব্যবস্থার সংস্কার এবং অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারকে নতুন সরকারের অগ্রাধিকার হিসেবে তুলে ধরা হয়।
সমর্থকদের কাছে এই অধ্যায় বিএনপির দীর্ঘ আন্দোলনের রাজনৈতিক পরিণতি; আর সমালোচকদের কাছে এটি নতুন পরীক্ষার শুরু। তবে বাস্তবতা হলো, বিএনপির ইতিহাসে এটি একটি নতুন যুগের সূচনা।
বিএনপির আদর্শ ও রাষ্ট্র চিন্তার উত্তরাধিকার
৪৮ বছরের পথচলায় বিএনপি নানা উত্থান-পতন, ক্ষমতা, বিরোধী রাজনীতি, আন্দোলন, দমন-পীড়ন এবং পুনরুত্থানের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয়েছে। দলটির মূল আদর্শিক ভিত্তি- বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ, বহুদলীয় গণতন্ত্র, জাতীয় সার্বভৌমত্ব, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং উৎপাদনমুখী অর্থনীতি- আজও এর রাজনৈতিক পরিচয়ের কেন্দ্রবিন্দু।
জিয়াউর রহমানের রাষ্ট্রদর্শন ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের আত্মপরিচয়কে শক্তিশালী করা; খালেদা জিয়ার রাজনীতি ছিল গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রাম; আর বর্তমান নেতৃত্ব সেই আদর্শকে নতুন রাষ্ট্রীয় বাস্তবতায় রূপ দেয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করছে।
৪৮ বছরের প্রাপ্তি ও প্রত্যাশা
বিএনপির প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী কেবল একটি দলীয় উদযাপন নয়; এটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের স্মরণ। মুক্তিযুদ্ধের এক জন বীর সেনা নায়ক থেকে রাষ্ট্রনায়ক হয়ে ওঠা জিয়াউর রহমান যে রাজনৈতিক সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, সেটি সময়ের পরীক্ষায় বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়েছে।
ইতিহাসে কোনো রাজনৈতিক দল নিখুত নয়; সাফল্য যেমন থাকে, তেমনি বিতর্কও থাকে। তবু বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিএনপির অবদান মূল্যায়ন করতে হলে বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তন, জাতীয় পরিচয়ের রাজনৈতিক রূপায়ণ, অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতার ধারণা এবং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনে দলটির ভূমিকাকে অস্বীকার করা যায় না।
৪৮ বছরে দাড়িয়ে বিএনপির সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো প্রতিষ্ঠাতার ঘোষিত গণতন্ত্র, জবাবদিহি, ন্যায়বিচার ও উন্নয়নের আদর্শকে বাস্তব রাষ্ট্র পরিচালনায় আরো কার্যকরভাবে প্রতিষ্ঠা করা। কারণ রাজনৈতিক ইতিহাস শেষ পর্যন্ত দল নয়, রাষ্ট্র ও জনগণের কল্যাণ দিয়েই বিচার করা হয়।

রাজু আলীম : কবি, সাংবাদিক, মিডিয়া ব্যক্তিত্ব

সর্বশেষ - সারাবাংলা