শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬ | ৭:০০ পিএম
  1. Lead News
  2. অপরাধ
  3. অর্থনীতি
  4. আইন-আদালত
  5. আন্তর্জাতিক
  6. আমরা
  7. কর্পোরেট
  8. খেলাধুলা
  9. গণমাধ্যম
  10. চাকুরীর খবর
  11. জাতীয়
  12. ধর্ম
  13. প্রবাস
  14. ফিচার
  15. বিজ্ঞান-প্রযুক্তি

আত্মসম্মানের সংস্কৃতিতেই সমৃদ্ধির নতুন সম্ভাবনা

প্রতিবেদক
যায়যায়দিন
September 1, 2026 7:12 pm

:: এ ইউ দৌলা ::

আমরা সারাদিন নানা কাজে ছুটে চলি। কেউ টাকার পেছনে, কেউ ক্ষমতার পেছনে, কেউ আরামদায়ক জীবনের খোঁজে, আবার কেউ নাম, যশ ও মর্যাদার মোহে সবকিছু করতে প্রস্তুত থাকে মানুষ। কিছু মানুষ আজীবন সত্যের অনুসন্ধানে তপস্যা করেন, আবার কেউ কেউ শুধু আত্মসম্মান বাঁচাতে হাসিমুখে প্রাণ বিসর্জন দেন। মানুষের অন্তরের এই মোটিভেশনের মূল উৎস খুঁজতে গিয়ে শত শত বছর ধরে আচরণবিজ্ঞান এবং বিবর্তনবাদী মডেলগুলো একটি সত্যকে বারবার সামনে নিয়ে এসেছে, তা হলো জৈবিক বেঁচে থাকা বা Survival ই মানব অস্তিত্বের মূল ভিত্তি। ১৯৪৩ সালে আমেরিকান মনোবিজ্ঞানী আব্রাহাম মাসলো এই বিষয়ে যে যুগান্তকারী তত্ত্ব দেন, তা আজও সবচেয়ে প্রসিদ্ধ। মাসলোর পর একে একে এসেছে ক্লেইটন আলডারফারের ERG তত্ত্ব, ভিক্টর ভ্রুমের প্রত্যাশা তত্ত্ব, হার্জবার্গের দ্বি-তত্ত্বসহ আরও বেশ কিছু মনস্তাত্ত্বিক মডেল।

তবে এসব তত্ত্বের মূল সুর যেন একই; বেঁচে থাকার তাগিদই মানব মনের সবচেয়ে মৌলিক মোটিভেশন যেখান থেকে অন্য সব প্রয়োজনের জন্ম হয়। মাসলোর Hierarchy of Needs তত্ত্বে দেখানো হয়েছে মানুষের প্রবৃত্তিগুলো যেন একটি পিরামিডের মতো একের পর এক স্তরে স্তরে উদয় হয়। যার মূলে রয়েছে শারীরিক ও বেঁচে থাকার চাহিদা, এরপর নিরাপত্তার চাহিদা, ভালোবাসার প্রয়োজন, খ্যাতির আকাঙ্ক্ষা এবং এই পিরামিডের সর্বশেষে রয়েছে আত্মোপলব্ধি বা Self-Actualization.

কিন্তু মানুষের মনস্তত্ত্ব কি সত্যিই কেবল জৈবিক বেঁচে থাকার গণ্ডির মধ্যেই মৌলিক ভাবে সীমাবদ্ধ? ইতিহাস এবং আমাদের প্রতিদিনের জীবন কিন্তু অন্য কথা বলে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, মানুষ বহুবার তার জীবন বা অস্তিত্ব বিপন্ন করে হলেও অন্যায়ের কাছে মাথা নত করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। তাই আজকের এই নিবন্ধে সেই চিরাচরিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে তুলে ধরা হয়েছে যে, আত্মসম্মান কীভাবে মানব আচরণ, সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং কর্মতৎপরতার সর্বোচ্চ মোটিভেশন হয়ে উঠতে পারে।

Self-Respect বা আত্মসম্মানকে মানব জীবনের সর্বোচ্চ চালিকাশক্তি হিসেবে বুঝতে হলে প্রথমে এর সাথে অন্যান্য নিকটবর্তী মনস্তাত্ত্বিক ধারণার পার্থক্য স্পষ্ট করা জরুরি। আধুনিক মনোবিজ্ঞানে Self-Esteem বা আত্মমর্যাদা বলতে ব্যক্তির নিজের প্রতি এক ধরনের মূল্যায়নমূলক অনুভূতি বোঝায়, যা তার দক্ষতা, সামাজিক তুলনা, পেশাগত সাফল্য এবং বাহ্যিক প্রশংসার ওপর নির্ভর করে। যেহেতু এই আত্মমর্যাদা বাইরের জগতের ফিডব্যাক বা অনুমোদনের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে, তাই এটি অত্যন্ত ভঙ্গুর। জীবনের কঠিন সংকটে যখন বাহ্যিক সাফল্য বা বেঁচে থাকার প্রশ্ন আসে, তখন এই আত্মমর্যাদা প্রায়ই ভেঙে পড়ে। পক্ষান্তরে, আত্মসম্মান কোনো ক্ষণস্থায়ী আবেগ বা বাহ্যিক প্রশংসার ওপর নির্ভরশীল নয়। এটি একজন নৈতিক সত্তা হিসেবে ব্যক্তির নিজের মূল্যবোধের একটি কাঠামোগত স্বীকৃতি। টমাস হিল এবং ইমানুয়েল কান্টের দর্শনে আত্মসম্মানকে বলা হয়েছে নৈতিক নীতিগুলোর প্রতি অবিচল থাকার এক অভ্যন্তরীণ অঙ্গীকার, যা বাহ্যিক সামাজিক বাহবা বা চাপের কাছে কখনো নতি স্বীকার করে না। একইভাবে, অহংকার বা প্রাইড পুরোপুরি ভাবেই খ্যাতি, সামাজিক প্রতাপ ও মানুষের বাহবার সাথে জড়িত। কিন্তু আত্মসম্মান কোনো দর্শক বা বাহ্যিক শ্রোতার মুখাপেক্ষী নয়; মানুষ যখন সম্পূর্ণ একা থাকে, যখন কেউ তাকে দেখে না, ঠিক সেই মুহূর্তেই এটি একই ভাবে সক্রিয় থাকে। কান্টের দর্শন এবং কগনিটিভ ডিসোন্যান্স তত্ত্ব অনুযায়ী, নিজের কাছে নিজে লজ্জিত হওয়ার গ্লানি অনেক সময় জৈবিক অস্তিত্বহীনতার পরিস্থিতিকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে।

আত্মসম্মানের শক্তি নাকি বেঁচে থাকার চাহিদা, কোনটি মানুষকে বেশি মোটিভেটেড করে, তা যাচাই করতে গিয়ে গবেষকদের মুখোমুখি হতে হয় এক নৈতিক সীমার। কিন্তু মানব জীবনের চরম অস্তিত্বমূলক পরিস্থিতি নিয়ে সরাসরি পরীক্ষামূলক গবেষণা চালানো নৈতিক ও ব্যবহারিক দিক থেকে অসম্ভব। কোনো গবেষণায় মানুষকে ইচ্ছাকৃতভাবে জীবন-মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে নৈতিক আত্মসমর্পণ বা আত্মহননের পরীক্ষা করা যায় না। এই কারণে আমাদের আশ্রয় নিতে হয়েছে থট এক্সপেরিমেন্টের।

কল্পনা করুন এমন একটি মহাবিধ্বংসী ও অত্যন্ত মারাত্মক মহামারির কথা, যার মৃত্যুহার COVID-19 কে বহুলাংশে ছাড়িয়ে গেছে এবং একটি জাতি আজ বিলুপ্তির মুখে এসে দাঁড়িয়েছে। এমন সময় ৭৫ বছর বয়সি একজন প্রবীণ বিজ্ঞানী ও চিকিৎসক, যিনি নিজেও ওই রোগে আক্রান্ত, তিনি একটি গবেষণাগারে সম্পূর্ণ একা কাজ করে সফলভাবে প্রতিষেধকের মাত্র একটি কার্যকরী ডোজ প্রস্তুত করেছেন। ধরা যাক, এই ডোজটি শুধুমাত্র একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষের শরীরের উপযোগী, কিংবা দুটি শিশুর শরীরের উপযোগী। এখন তিনি এটি নিজের জন্য ব্যবহার করে বেঁচে থাকতে পারেন, কিংবা গবেষণাগারের পাশে হাস্পাতালে তখনও থাকা মাত্র দুটি শিশুর প্রাণ বাঁচাতে তাদের শরীরে প্রয়োগ করতে পারেন।
ধরুন, এই আবিষ্কারের কথা আর কেউ জানে না, সেখানে কোনো সিসি ক্যামেরা বা নজরদারির ব্যবস্থা নেই, তাঁর কাজ বিচার করার মতো কোনো সহকর্মী নেই, এবং তাঁর এই সিদ্ধান্তের কথা কোনো ঐতিহাসিক দলিলেও কখনো লেখা থাকবে না। যদি তিনি নিজে এই ইনজেকশন নেন, তবে তিনি বেঁচে যাবেন কিন্তু শিশুসহ বাকি পুরো জাতি চিরতরে ধ্বংস হয়ে যাবে। আর যদি তিনি ডোজটি শিশুদের দেন, তবে ওই রোগের কারণে তাঁর নিজের মৃত্যু নিশ্চিত।

এই পরিস্থিতিটি সমস্ত ধরনের সামাজিক জবাবদিহিতা, সহকর্মীদের নজরদারি এবং খ্যাতির সম্ভাবনাকে পুরোপুরি মুছে ফেলে। আত্মত্যাগের এই মহিমান্বিত কাজের প্রশংসা করার মতো সেখানে কোনো দর্শক নেই, আবার আত্মরক্ষার পথ বেছে নিলে তার জন্যও কোনো শাস্তির বিধানও নেই। এই বয়োবৃদ্ধ বিজ্ঞানীর সামনে এখন দুটি মাত্র চরম পথ খোলা, নিজের জীবনকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বেঁচে থাকা রাখা, নাকি জাতির ভবিষ্যৎ বীজ হিসেবে এই শিশুদের রক্ষা করা।

প্রথাগত মোটিভেশন মডেলগুলো হয়তো ধারণা করবে যে চিকিৎসক নিজের আত্মরক্ষাটাই সবার আগে বেছে নেবেন, বিশেষ করে এমন এক সম্পূর্ণ নিঃসঙ্গ অবস্থায় যেখানে নীতিভঙ্গ করলে কোনো সামাজিক মূল্য বা শাস্তি দিতে হয় না। তবুও, বিবেকের এই চরম পরীক্ষার মুখোমুখি হলে হয়ত সেই ব্যক্তি উপলব্ধি করতে পারেন যে, একটি জাতির বিলুপ্তির বিনিময়ে নিজের বেঁচে থাকাকে প্রাধান্য দিলে তা তাঁর নৈতিক সত্তার মূল ভিত্তিকেই চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেয়। এমন পরিস্থিতিতে অনেকে হয়তো নিজের জীবন বাঁচানোকেই বেছে নিতে পারেন, তবে ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে অতীতেও এমন দৃষ্টান্ত রয়েছে যেখানে মানুষ ঠিক এইরকম পরিস্থিতিতে আত্মত্যাগকে বেছে নিয়েছিলেন, কারণ তারা মনে করেছিল আত্মত্যাগই হলো একমাত্র সঠিক কাজ।

তাহলে এর অর্থ কি এই নয় যে, কোনো কোনো মানুষ কোনো না কোনো পরিস্থিতিতে জীবন বাজি রেখেও শুধু নিজের অন্তরের গভীরে ধারণ করা সত্য বা বিশ্বাস রক্ষা করার জন্য সবচেয়ে শক্তিশালী মোটিভেশন পেতে পারে? এর মানে কি আসলে এই নয় যে শুধু আত্মসম্মানই জীবনের সবচেয়ে শক্তিশালী বড় মোটিভেশন হতে পারে। হাঁ, সম্ভব তবে শুধু আত্মসম্মানই নয় বরং একেক জনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে শক্তিশালী মোটিভেশন নানা রকম হয়ে হয়ে উঠতে পারে। কারো জন্য সেটি হতে পারে তার সুনাম বা রেপুটেশন, কারো জন্য সবচেয়ে শক্তিশালী হতে পারে টাকা, ব্যবসা, খ্যাতি কিংবা কোনো ভালোবাসার বস্তু বা মানুষ।

তাই মোটিভেশনকে যদি একটি নির্দিষ্ট পিরামিড হিসেবে না ভেবে গ্যাস ভর্তি বেলুনের সাথে তুলনা করি, তবে দেখব প্রতিটি মানুষের অন্তরে প্রায় সব ধরণের মোটিভেশনের বেলুন উড়ছে এবং তাকে নিজের দিকে টেনে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। তবে যার মস্তিষ্কে যে মোটিভেশনের বেলুন যত বড় বা যত বেশি শক্তিশালী, তার আচরণ ও সিদ্ধান্তগুলো অন্য সব আকর্ষণকে পেছনে ফেলে সেই দিকেই এগিয়ে যায়।

এই তত্ত্ব আমাদের গভীরভাবে উপলব্ধি করায় যে, আত্মসম্মানকে যদি বিশুদ্ধ সততা, দায়িত্ববোধ আর বিনয়ের মাধ্যমে সংজ্ঞায়িত করা যায়, যদি সেই সংস্কৃতির চর্চা নাগরিক সমাজের মাঝে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দেওয়া যায়, যদি আত্মসম্মানকে সবচেয়ে মজবুত সংস্কৃতিতে পরিনত করা যায়, যদি আত্মসম্মানকে স্কুল-কলেজ- বিশ্ববিদ্যালয়- মিডিয়া সব স্থানে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়ে প্রচার ও চর্চার ব্যবস্থা করা যায়, তবে তা একটি সমাজ বা রাষ্ট্রের সব ধরণের অনিয়ম, দুর্নীতি, অপরাধ, বিশৃঙ্খলা ও অসহিষ্ণুতা কমিয়ে আনতে অসামান্য ভূমিকা রাখতে পারে। ছোট্ট একটি ঘূর্ণি থেকে সৃষ্টি হওয়া বাতাস যেমন ধীরে ধীরে পুঞ্জীভূত হয়ে সিডরের মতো প্রলয়ী শক্তি ধারণ করে সবকিছু মুছে দিতে পারে, তেমনি আত্মসম্মানের চর্চার মত একটিমাত্র ইতিবাচক সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তনও সমাজের চরম নৈরাজ্য দূর করে শান্তির সুবাতাস সৃষ্টি করতে সক্ষম হতে পারে।

(মাইন্ড-ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ের গবেষক)

সর্বশেষ - সারাবাংলা