:: আয়শা সিদ্দিকা হিমি ::
শান্তি, সহমর্মিতা এবং মানবিক মূল্যবোধের কথা বলে যে ধর্ম, সেই একই ধর্মের দোহাই দিয়ে আজ মানুষের মধ্যে কেন এত বিভাজন? আমাদের সমাজে আজ ধর্মের মূল নির্যাসটুকুর চেয়ে বাহ্যিক লেবেল আর সাম্প্রদায়িক পরিচয় অনেক বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। ধর্মের নামে গড়ে তোলা এই কৃত্রিম দেয়ালগুলো কেবল ভ্রাতৃত্বকেই নষ্ট করছে না, বরং একটি সুস্থ ও সহনশীল সমাজব্যবস্থাকে ভেতর থেকে কুরে কুরে খাচ্ছে।
ধর্মের অন্তরালে আজ একদল স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী সাধারণ মানুষের আবেগ আর বিশ্বাসকে পুঁজি করে নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করছে। তথাকথিত এই ‘ধর্মীয় ব্যবসায়ীরা’ ধর্মকে মানুষের মুক্তির পথ না বানিয়ে বরং একে ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা পূরণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন। তাদের মূল লক্ষ্য ধর্ম প্রচার নয়, বরং ধর্মের দোহাই দিয়ে একচেটিয়া ক্ষমতা আর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা।
সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, একই ধর্মের অনুসারী হওয়া সত্ত্বেও আমাদের ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর পরিচয়ে বিভক্ত করে দেওয়া হচ্ছে। এই বিভাজনের বিষবাষ্প ব্যবহার করে উগ্রপন্থীরা সাধারণ মানুষের মনে বিদ্বেষ ছড়িয়ে দিচ্ছে। তারা সুকৌশলে মানুষকে শিখিয়ে দিচ্ছে, কে নিজের আর কে বাইরের। ফলে সমাজ আজ পরমতসহিষ্ণুতা হারিয়ে এক চূড়ান্ত অসহিষ্ণুতার দিকে ধাবিত হচ্ছে। যখন কোনো মানুষ বা গোষ্ঠী ন্যায়ের কথা বলে, সমঅধিকারের দাবি তোলে, তখনই ধর্মের এই স্বঘোষিত রক্ষকরা তাকে ‘টার্গেট’ করে। ধর্মের নামে দেওয়া হয় হুমকির তকমা, কেড়ে নেওয়া হয় স্বাধীনভাবে কথা বলার নাগরিক অধিকার।
প্রশ্ন জাগে, ধর্মের নামে এই দখলদারিত্ব আর কতকাল? বিশ্বাস তো হওয়া উচিত আত্মার শান্তির জন্য, কাউকে ভয় দেখানো বা ছোট করার জন্য নয়। অথচ আমরা দেখছি, সাধারণ মানুষ এই ক্ষমতার লড়াইয়ে নিভৃতে আর্তনাদ করছে। সাধারণের ধর্মভীরুতাকে কাজে লাগিয়ে একদল মানুষ যখন দম্ভের সাথে ঘোষণা করে যে ‘এই দেশ বা এই অধিকার কেবল তাদেরই’, তখন বুঝতে হবে আমরা ধর্মের মানবিক শিক্ষাকে অনেক আগেই বিসর্জন দিয়েছি।
ক্ষমতার লালসা আর ধর্মীয় ব্যবসার এই চক্র থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। ধর্মের প্রকৃত সৌন্দর্য নিহিত আছে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধে, অন্যের বিশ্বাসকে আক্রমণ করার মধ্যে নয়। সাধারণ মানুষকে বুঝতে হবে, যারা বিভাজন তৈরি করে ঘৃণা ছড়ায়, তারা আসলে কোনো ধর্মেরই প্রকৃত বন্ধু নয়। যেদিন আমরা বিশ্বাসের নামে ঘৃণা ছড়ানো বন্ধ করতে পারব এবং ধর্মের অপব্যবহারকারীদের রুখে দিতে পারব, সেদিনই সমাজে প্রকৃত শান্তি ফিরে আসবে। মানুষের বিশ্বাস যেন কারো ব্যবসার উপাদান না হয়, এটিই আজকের সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

















