শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬ | ৬:৫৭ পিএম
  1. Lead News
  2. অপরাধ
  3. অর্থনীতি
  4. আইন-আদালত
  5. আন্তর্জাতিক
  6. আমরা
  7. কর্পোরেট
  8. খেলাধুলা
  9. গণমাধ্যম
  10. চাকুরীর খবর
  11. জাতীয়
  12. ধর্ম
  13. প্রবাস
  14. ফিচার
  15. বিজ্ঞান-প্রযুক্তি

দিল্লির দ্বিচারিতা চলছেই

প্রতিবেদক
যায়যায়দিন
August 22, 2026 7:30 pm

:: আহসান হাবিব বরুন ::
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের অভূতপূর্ব ও রক্তক্ষয়ী স্বতঃস্ফূর্ত ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে সাড়ে ১৫ বছরের এক দীর্ঘ, শ্বাসরুদ্ধকর ও নিপীড়নমূলক যৌথ-ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান ঘটে। হাজারো শহীদের আত্মত্যাগ এবং হাজার হাজার মানুষের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত এই নতুন স্বাধীনতা যখন দেশকে গণতন্ত্র, সাংবিধানিক শৃঙ্খলা, আইনের শাসন ও ভঙ্গুর অর্থনীতি পুনর্গঠনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে, ঠিক তখনই বিজিত ফ্যাসিবাদী শক্তি এবং তাদের বিদেশী পৃষ্ঠপোষকরা শুরু করেছে নতুন এক গভীর ও বহুমুখী চক্রান্ত।
সম্প্রতি ভারতের অন্যতম প্রাচীন ও প্রভাবশালী ইংরেজি দৈনিক ‘The Pioneer’-এ প্রকাশিত পলাতক ও পদচ্যুত স্বৈরাচার শেখ হাসিনার একটি বিস্তৃত নিবন্ধকে কেন্দ্র করে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন করে তোলপাড় শুরু হয়েছে। নিবন্ধটিতে শেখ হাসিনা জুলাই-আগস্টের অভূতপূর্ব জনবিস্ফোরণকে একটি “সুচিন্তিত উগ্রবাদী চক্রান্ত” হিসেবে চিত্রায়িত করার অপচেষ্টা করেছেন। একই সাথে তিনি বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূস, প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীকে লক্ষ্য করে চরম নির্লজ্জ বিষোদগার করেছেন।
কিন্তু এই নিবন্ধ কেবল একজন পরাজিত স্বৈরাচারের প্রলাপ নয়; বরং এর পেছনে রয়েছে দিল্লি এবং তার আশ্রিত পলাতক শক্তির এক সমন্বিত রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক চিত্রনাট্য। এই ঘটনায় সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে দিল্লির ক্রমাগত দ্বিচারিতা, তাদের অচল চাণক্য কৌশল এবং বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতাকে মেনে নিতে চরম অনিচ্ছা।
শেখ হাসিনার এই নিবন্ধে কোনো নতুন বক্তব্য বা দর্শন নেই, এটি মূলত তাঁর সেই বহু পুরোনো, জরাজীর্ণ ও সুবিধাবাদী ‘উগ্রবাদ-জঙ্গিবাদের বয়ান’ বা এক্সট্রিমিজম ন্যারেটিভের পুুনরাবৃত্তি। দীর্ঘ দেড় দশক ধরে দেশে ভোটবিহীনভাবে ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য তিনি দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে যে ভয় দেখানোর রাজনীতি বা ‘ফিয়ার সাইকোসিস’ তৈরি করেছিলেন, এই নিবন্ধের মাধ্যমে তিনি এবং তাঁর সহযোগীরা সেই একই ধোঁকাবাজির তাস আবার টেবিলে নিয়ে এসেছেন।
কিন্তু এখানে সবচেয়ে বড় ও বিপজ্জনক প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে ভারত সরকারের দ্বিমুখী আচরণ নিয়ে। গত ৫ আগস্ট দিল্লিতে অবস্থানকালে ভার্চুয়ালি সংবাদ সম্মেলন করে শেখ হাসিনা যখন চরম উস্কানিমূলক ও জনমনে অসন্তোষ ছড়ানোর মতো বক্তব্য দিয়েছিলেন, তা ঢাকা ও দিল্লির কূটনৈতিক সম্পর্কে অভূতপূর্ব টানাপোড়েন সৃষ্টি করেছিল। পরবর্তীতে দুই দেশের বরফ গলাতে কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু হলে ভারতীয় নীতিনির্ধারকরা বারবার মিষ্টি কথা বলেছিলেন।
ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালিসিস উইং (RAW)-এর শীর্ষ প্রতিনিধি ও উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল যখন ঢাকায় আসেন এবং নিরাপত্তা ও সামরিক কর্মকর্তাদের সাথে বৈঠক করেন, তখন তারা স্পষ্ট আশ্বাস দিয়েছিলেন যে শেখ হাসিনা যাতে ভারতের মাটিতে বসে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি বা সরকার সম্পর্কে কোনো ধরনের বিষোদগার বা নাক গলানোর সুযোগ না পান, সে বিষয়ে দিল্লি কঠোর পদক্ষেপ নেবে।
এমনকি ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী যখন বিএনপি নেতৃত্বের সাথে বৈঠকে বসেন, তখনও দুই দেশের সম্পর্ক এগিয়ে নিতে ‘অনুকূল পরিবেশ’ তৈরির প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছিল। সেসময় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে যে ইতিবাচক বাতাবরণ তৈরির কথা আলোচনায় ছিল, তাতে স্পষ্ট শর্ত বা বার্তা ছিল—দিল্লিকে আগে প্রমাণ করতে হবে যে তারা বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও জনআকাঙ্ক্ষাকে সম্মান করে এবং পলাতক স্বৈরাচারকে উস্কানির রসদ দেওয়া বন্ধ করে একটি অনুকূল কূটনৈতিক পরিবেশ তৈরি করেছে।
কিন্তু দিল্লি শেষ পর্যন্ত কী করলো? অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা তো দূরের কথা, ভারতীয় নীতিনির্ধারকরা তাদের অন্যতম প্রধান কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে ‘হাসিনা কার্ড’ খেলা অব্যাহত রাখলো। যে হাসিনা ইস্যুতে দুই দেশের ইতিবাচক কূটনৈতিক অগ্রগতি ও তারেক রহমানের বহুল আলোচিত ভারত সফর থমকে আছে বা ঝুলে আছে, সেখানে ভারত শেখ হাসিনাকে নিয়ন্ত্রণ না করে বরং তাঁদের জাতীয় প্রচারমাধ্যমে বাংলাদেশবিরোধী বিষোদগারের অবাধ সুযোগ করে দিল। দিল্লির এই সুস্পষ্ট শত্রুভাবাপন্ন ও দ্বিমুখী আচরণ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
এখানে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো যে,ভারতের এই দ্বিচারিতা ও প্রোপাগান্ডা কেবল শেখ হাসিনাকে নিবন্ধ লেখার সুযোগ দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং ভারতের মূলধারার গণমাধ্যমগুলো উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে খবর তৈরি করে বাংলাদেশের ওপর মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করতে চাইছে। সম্প্রতি ভারতীয় গণমাধ্যম বিশেষ করে NDTV হঠাৎ করে বিভ্রান্তিকর খবর প্রচার করে যে, অতি শীঘ্রই ভারতের আমন্ত্রণে নয়াদিল্লি সফরে যাচ্ছেন তারেক রহমান। শুধু তাই নয়, ‘পিএম তারেক রহমান ভিজিট স্টেটমেন্ট’ সংক্রান্ত খবরে ‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’ উল্লেখ করে যে, ভারতীয় কর্তৃপক্ষ ও রাষ্ট্রপতির কার্যালয় থেকে প্রথমে তারেক রহমানের আগমনের প্রস্তুতি ও মহড়ার বিষয়ে একটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয় এবং এক ঘণ্টার মধ্যে আবার তা প্রত্যাহার করে নিয়ে চরম নাটকীয়তা ও অস্পষ্টতার সৃষ্টি করা হয়। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয় থেকেও এই বিষয়ে চরম বিভ্রান্তিকর ও দায়সারা বক্তব্য দেওয়া হয়।
প্রশ্ন হচ্ছে, ভারতের পররাষ্ট্র দফতর এবং তাদের মূলধারার গণমাধ্যম কেন একই সাথে এমন খাপছাড়া, অসংলগ্ন এবং বিভ্রান্তিকর নাটক সাজালো? এর মূল উদ্দেশ্য ছিল ঢাকাকে এবং বাংলাদেশের উদীয়মান রাজনৈতিক নেতৃত্বকে এক ধরনের মানসিক ও স্নায়ুচাপের বা সাইকোলজিক্যাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক প্রেশারের মধ্যে রাখা। ভারত দেখাতে চায় যে তারা এখনও দক্ষিণ এশিয়ার ‘বিগ ব্রাদার’ এবং তারা যখন ইচ্ছা বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।
কিন্তু দিল্লির চাণক্য নীতিনির্ধারকরা হয়তো বেমালুম ভুলে গেছেন যে, ২০২৪ সালের আগস্ট-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট আর বিগত দেড় দশকের গোলামির প্রেক্ষাপট মোটেও এক নয়। দিল্লির এই ধরনের অপকৌশল দিয়ে ঢাকাকে এখন আর বাস্তবতা থেকে বিচ্যুত করা সম্ভব নয়। বিএনপির নেতৃত্বসহ বাংলাদেশের প্রতিটি গণতান্ত্রিক শক্তি ইতিমধ্যেই স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে যে—সমতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, জাতীয় স্বার্থ এবং বাংলাদেশের জনগণের সার্বভৌম আকাঙ্ক্ষাকে পদদলিত করে ভারতের সাথে কোনো নতজানু সম্পর্ক গড়ে তোলা হবে না।
দিল্লির একটি বড় ভ্রান্ত ধারণা হলো, তারা হয়তো বিদ্যুৎ, জ্বালানি তেল কিংবা খাদ্য সামগ্রী রফতানির কার্ড খেলে বাংলাদেশকে চাপে রাখতে পারবে। বিশেষ করে শেখ হাসিনার শাসনামলে ভারতের আদানি গ্রুপের সাথে বাংলাদেশ যে বিদ্যুৎ চুক্তি করেছিল, তা ছিল বিশ্ব ইতিহাসের অন্যতম বৈষম্যমূলক, একপেশে ও লুটেরা চুক্তি। আন্তর্জাতিক বাজারমূল্যের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি দামে বিদ্যুৎ কেনার সেই দায় এখন বাংলাদেশকে বইতে হচ্ছে। দিল্লি যদি ভেবে থাকে বিদ্যুৎ বা জ্বালানি কাটার ভয় দেখিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বা দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক দলগুলোকে নিজেদের রাজনৈতিক এজেন্ডা মানতে বাধ্য করবে, তবে তারা দিবাস্বপ্ন দেখছে।
বাংলাদেশ ভারতের কাছ থেকে কোনো দয়া বা দান চায় না। জ্বালানি ও বিদ্যুৎ বাংলাদেশ কোনো কম মূল্যে পাচ্ছে না; বরং আন্তর্জাতিক বাজারের চেয়েও বেশি দামে নগদ অর্থ দিয়ে কিনে নিচ্ছে। ভারতের এই আধিপত্যবাদী মনস্তত্ত্ব উপলব্ধি করেই বাংলাদেশের জনগণ আজ প্রস্তুত। দেশের মানুষ প্রয়োজনে লোডশেডিং সইবে, অন্ধকার দিন পার করবে, তবুও ভারতের নব্য-উপনিবেশবাদী ব্ল্যাকমেইল বা আধিপত্য মেনে নেবে না। তদুপরি, বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক মানচিত্রে ইউরোপ, আমেরিকা, চীন, জাপান ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো এখন বাংলাদেশের সাথে শক্তিশালী অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক অংশীদারিত্বে এগিয়ে এসেছে। ফলে ভারত নিজেকে প্রত্যাহার করে নিলে আলটিমেটলি ভূ-রাজনৈতিকভাবে তাদের নিজেদেরই চরম খেসারত দিতে হবে।
‘The Pioneer’-এ প্রকাশিত নিবন্ধে শেখ হাসিনা দাবি করেছেন যে, তাঁর দেড় দশকের শাসনে বাংলাদেশ ৩৫তম অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়েছিল, যা মাত্র এক বছরে বর্তমান সরকার ধ্বংস করে দিয়েছে। তিনি নিজেকে অসাম্প্রদায়িকতার প্রতীক এবং প্রতিপক্ষকে উগ্রবাদী বলে চিহ্নিত করেছেন।
কিন্তু ইতিহাস ও বাস্তব পরিসংখ্যান এই ধৃষ্টতাপূর্ণ মিথ্যাচারকে মুহূর্তেই গুড়িয়ে দেয়। শেখ হাসিনা যে তথাকথিত “উন্নয়ন” এর গল্প বলছেন, তা ছিল মূলত মেগা-প্রজেক্টের নামে মেগা-দুর্নীতি, লক্ষ কোটি টাকা বিদেশে পাচার এবং ব্যাংক খাত ধ্বংস করার এক সর্বগ্রাসী মডেল। তিনি নিবন্ধে অত্যন্ত ক্ষোভের সাথে উল্লেখ করেছেন যে, গত জুলাইয়ে প্রতিটি মৃত্যুর তদন্তে তিনি বিচার বিভাগীয় কমিশন গঠন করেছিলেন, যা বর্তমান সরকার স্থগিত করেছে। এটি একটি চরম তামাশা! সমগ্র বিশ্ব আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে সরাসরি দেখেছে কীভাবে শেখ হাসিনার নির্দেশে হেলিকপ্টার থেকে স্নাইপার দিয়ে, পুলিশের প্রাণঘাতী রাবার বুলেট ও তাজা গুলি দিয়ে দেড় হাজারের বেশি নিরীহ শিক্ষার্থী, শিশু ও আমজনতাকে পাখির মতো গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। নিজেদের হাত রক্তে রঞ্জিত করে এখন তিনি আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভিকটিম সাজার চেষ্টা করছেন এবং ড. ইউনূস ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ওপর দোষ চাপিয়ে দায়মুক্তির গল্প ফাঁদছেন।
শেখ হাসিনার এই বহুল প্রচারিত নিবন্ধ এবং ভারতের অবস্থান বিশ্লেষণ করলে আরও একটি ভয়াবহ চিত্র উদঘাটিত হয়। সম্প্রতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে যে, বাংলাদেশের ভেতরেরও কিছু সুযোগসন্ধানী ও নির্দিষ্ট মতাদর্শের গণমাধ্যমে হঠাৎ করে জঙ্গিবাদ, উগ্রবাদ ও সংখ্যালঘু নির্যাতনের কথিত খবর জোরেশোরে প্রচার করা শুরু হয়েছে। এসব প্রতিবেদনের ধরন, সময় নির্বাচন এবং শব্দচয়ন অদ্ভুতভাবে শেখ হাসিনার ‘The Pioneer’ নিবন্ধ এবং ভারতীয় গোয়েন্দা মিডিয়ার বয়ানের সাথে হুবহু মিলে যাচ্ছে। এটি কি কেবলই কাকতালীয়, নাকি কোনো গভীর পরিকল্পিত চিত্রনাট্য? political ও সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি আসলে শেখ হাসিনা, ভারতীয় নীতিনির্ধারক গোষ্ঠী এবং বাংলাদেশে অবস্থানরত তাদের সুশীল ও সংবাদমাধ্যমীয় দোসরদের যৌথভাবে রচিত এক বিপজ্জনক নাটকের অংশ।
এখানে পুরো পরিকল্পনাটি মূলত তিনটি ধাপে বিন্যস্ত করা হয়েছে। প্রথম ধাপে বাংলাদেশে কৃত্রিমভাবে উগ্রবাদ ও অস্থিতিশীলতার ভয় তৈরি করার চেষ্টা করা হচ্ছে। দ্বিতীয় ধাপে দেশীয় গণমাধ্যম ও ভারতীয় মিডিয়ায় তা সমন্বিতভাবে প্রচার করে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হচ্ছে। এবং তৃতীয় ধাপে বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশকে একটি “বিপজ্জনক অস্থিতিশীল উগ্রবাদী রাষ্ট্র” হিসেবে চিহ্নিত করে কোনো বিশেষ দৃশ্যপট বা স্পেশাল সিনারিও তৈরি করা হচ্ছে, যার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপ ও পতিত শক্তির রাজনৈতিক পুনর্বাসনের রাস্তা সুগম করা যায়। এই পরিকল্পিত প্রোপাগান্ডা ও চক্রান্তের বিষয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, রাজনৈতিক দলগুলো এবং প্রতিটি দেশপ্রেমিক নাগরিককে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে।
হাসিনা ও ভারতের সেই পুরনো উগ্রবাদ এবং জঙ্গিবাদের বয়ান এবং সম্প্রতি বাংলাদেশের গণমাধ্যমে যেসব জঙ্গিবাদের খবর ও বিশ্লেষণ প্রকাশিত হচ্ছে, এসব বিষয়ে বিশেষ করে সরকার ও রাষ্ট্রীয় নীতি-নির্ধারকদের সর্বোচ্চ সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। উদ্দেশ্যপ্রণোদিত যেকোনো সংবাদ প্রচার এবং তার সাথে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান কিংবা ব্যক্তিকে কঠোরভাবে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।
এখানে আমি  রাষ্ট্রনায়ক প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে স্পষ্ট করে বলতে চাই—বাংলাদেশের মতো একটি বহুমাত্রিক চক্রান্তের জটিল ভূ-রাজনৈতিক পরিবেশে কেবল অতি-শালীনতা, সৌজন্যতা আর ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে দেশ চালানো বা রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা রক্ষা করা সম্ভব নয়। কিছু কিছু ক্ষেত্রে আপনাকে এবং দেশের নীতি-নির্ধারকদের কঠোরতা ও অনুশাসন দেখাতে হবে; বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থে এবং সার্বভৌমত্ব রক্ষার স্বার্থে এই কঠোরতা এখন সময়ের দাবি। কারণ অব্যাহতভাবে জঙ্গিবাদ ও উগ্রবাদের যে প্রোপাগান্ডামূলক বয়ান হাসিনা এবং দিল্লি জারি রেখেছে, তা যে এক সুদূরপ্রসারী অশুভ পরিকল্পনার অংশ—এ কথা ভুলে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশে মগ্ন থেকে মাঠপর্যায়ের এই বিপজ্জনক বাস্তবতার দিকে কড়া নজর না রাখলে যেকোনো সময় বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে আসতে পারে।
বরং এখানে আমি প্রস্তাব করতে চাই—জঙ্গিবাদ ও উগ্রবাদের এই পরিকল্পিত বয়ান এবং বাংলাদেশের প্রচলিত গণমাধ্যমের উদ্দেশ্যপ্রণোদিত খবরা-খবরের বিষয়ে একটি “বিশেষ মিডিয়া মনিটরিং সেল” গঠন করা অত্যন্ত জরুরি। এই মনিটরিং সেলের প্রধান কাজ হবে দেশি-বিদেশি প্রতিটি অপপ্রচার ও প্রোপাগান্ডার বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক সঠিক তথ্যভিত্তিক প্রতিক্রিয়া তৈরি করা এবং তা বিশ্ব দরবারে তুলে ধরা। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে, শেখ হাসিনার আমলে ভারতের ইন্দনে এবং ভারতের কুখ্যাত গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ (RAW)-এর প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় এদেশের বহু নিরপরাধ, দেশপ্রেমিক মানুষের জীবন ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে, অগণিত মানুষের প্রাণ কেড়ে নেয়া হয়েছে এবং বহু সম্ভ্রান্ত মানুষের সুন্দর জীবনে কলঙ্ক লেপন করা হয়েছে। সেই একই চক্র আবারও গণমাধ্যমকে ব্যবহার করে নতুন ফাঁদ পাতছে।
আমি আগেও একাধিকবার উল্লেখ করেছি, বাংলাদেশকে নিয়ে পরাশক্তি ও প্রতিবেশী রাষ্ট্রের অশুভ খেলা কিন্তু শেষ হয়ে যায়নি; বরং অভ্যুত্থান-পরবর্তী নতুন বাংলাদেশে সেই খেলা আরও গভীর ও সূক্ষ্ম রূপ নিয়ে নতুন করে শুরু হয়েছে। দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের দেশের কিছু রাজনীতিবিদ ও রাজনৈতিক দল এখনও “ক্ষমতার গদি” দখল করাকেই তাদের রাজনীতির একমাত্র লক্ষ্য বানিয়ে ফেলেছেন। রাজনীতিবিদদের এই কঠোর সত্যটি উপলব্ধি করতে হবে—যদি শুধুমাত্র ক্ষমতার গদিকে ঘিরে কাটাকাটি ও কাদা ছোড়াছুড়ির রাজনীতি চলতে থাকে, তবে জাতীয় ঐক্য দুর্বল হয়ে পড়বে। আর জাতীয় ঐক্য বিনষ্ট হলে দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং জুলাই অভ্যুত্থানের অর্জনগুলোর ওপর এমন বড় ধরনের আঘাত আসবে যা সামলানো অসম্ভব হয়ে পড়বে। ক্ষমতার রাজনীতি সাময়িক বন্ধ রেখে এখন সবচেয়ে বড় কর্মসূচী হওয়া উচিত—জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষা, মিডিয়া প্রোপাগান্ডা নস্যাৎ করা এবং ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে এক ইস্পাতকঠিন গণতান্ত্রিক জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলা।
পরিশেষে বলতে চাই,ভারতকে বুঝতে হবে যে, চাণক্যনীতির দিন শেষ হয়ে গেছে। একবিংশ শতাব্দীর সচেতন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সোচ্চার এবং রক্ত দিয়ে স্বৈরাচার তাড়ানো তরুণ প্রজন্মের বাংলাদেশকে তারা বিগত দিনের মতো নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না। বাংলাদেশের সাথে সুস্থ কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখতে হলে ভারতকে ‘হাসিনা কার্ড’ এবং ‘উগ্রবাদের জুজু’র রাজনীতি থেকে চিরতরে বের হয়ে আসতে হবে। আর বাংলাদেশের ভেতরে থাকা প্রতিটি নাগরিক, সাংবাদিক ও রাজনীতিবিদকে মনে রাখতে হবে—আমাদের অস্তিত্ব, আমাদের দ্বিতীয় স্বাধীনতা এবং আমাদের সার্বভৌমত্বকে রক্ষা করার লড়াইয়ে কোনো শিথিলতার সুযোগ নেই। প্রোপাগান্ডার প্রতিটি ইটের জবাব সত্যের পাথর ছুড়ে দিতে হবে; তবেই ভারতের দ্বিচারিতা আর পরাজিত স্বৈরাচারের অব্যাহত বিষোদগার সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হবে ইনশাল্লাহ।
লেখক:সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক
ই-মেইল: ahabibhme@gmail.com

সর্বশেষ - সারাবাংলা